আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (৪র্থ পর্ব)
জানালার ওপাশে বড় মেয়ের সেই হিমশীতল দৃষ্টি আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য করতে পারছিলাম না। তার সেই স্থির চোখ দুটো যেন আমার কলিজার ভেতরটা সরাসরি দেখে ফেলছে। সুনিল যখন আমার ওপর থেকে সামান্য সরে গিয়ে পাশের টিপয় থেকে নিজের গ্লাসটা হাতে নিল এবং আরও কিছুটা কড়া পানীয় ঢালল, আমি সেই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল, বোরকা আর হিজাব তখন কেবল নামমাত্র আমার গায়ে জড়িয়ে আছে, চুলগুলো অবিন্যস্ত। কিন্তু মাতৃত্বের এক তীব্র এবং অবর্ণনীয় তাড়না আমাকে দরজার দিকে ঠেলে দিল। আমি জানি আমার স্বামী ড্রয়িংরুমের ওপাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারায় আছেন, কিন্তু তিনি এখন হয়তো কোনো কিতাবে মগ্ন হয়ে নিজের সেই তথাকথিত 'পবিত্র' ভাবমূর্তি ধরে রাখার কসরত করছেন।
আমি পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে অত্যন্ত সাবধানে ভেতরের ছিটকিনিটা খুললাম। হৃদপিণ্ডের শব্দ তখন আমার নিজের কানেই ড্রামের মতো বাজছে। আমার স্বামী তখন ড্রয়িংরুমের কোণে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত, সেই সামান্য কয়েক সেকেন্ডের সুযোগে আমি অন্ধকার বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। আমার বড় মেয়ে তখনো জানালার পাশের ঘাসের ওপর একখণ্ড পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। আমি তাকে জাপ্টে ধরে অন্ধকারের আরও গভীরে, আড়ালে নিয়ে এলাম।
মেয়েটির শরীর যেন বরফের মতো জমে গেছে। তার চোখে কোনো জল নেই, নেই কোনো নালিশ; কেবল এক বিশাল, অতল শূন্যতা। আমি ফিসফিস করে কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম, "মা, তুই এখানে কেন? ভেতরে যা মা! যা দেখছিস তা সত্যি নয়... পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করেছে..."
আমার মেয়ে এবার ধীরলয়ে আমার দিকে তাকালো। তার সেই চাউনিতে এত বেশি ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা মিশে ছিল যে আমার মনে হলো সেই মুহূর্তে পৃথিবীটা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলে আমি তার ভেতর ঢুকে পড়তাম। সে কোনো কথা বলল না, কোনো আর্তনাদ করল না; শুধু আমার হাতটা এক হ্যাঁচকা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়ে অন্ধকারের ভেতর নিঃশব্দে মিলিয়ে গেল। আমি জানি, আজ থেকে এই অভিজাত বাড়ির প্রতিটি ইটে এক নতুন বিভীষিকার নাম লেখা হলো। আমার স্বামী এখনো হলের ওপাশে প্রশান্তিতে বসে আছেন, তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলেন না যে তার অতি আদরের সন্তানটি তার বাবার সেই পৈশাচিক ভণ্ডামির জ্যান্ত সাক্ষী হয়ে গেছে।
আমি আবার ঘরে ফিরে এলাম এবং দ্রুত ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিলাম। দরজা বন্ধ করতেই দেখলাম সুনিল বিছানায় পা তুলে আয়েশ করে বসে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে পৈশাচিক হাসি হাসছে। সে যেন মনে মনে জানত যে আমি এই নরক ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না, আমাকে ফিরে আসতেই হবে।
সুনিল এবার আর কোনো রাখঢাক বা ভদ্রতার মুখোশ রাখল না। সে হাতের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন লালসার দাবানল। "মেয়ের সাথে মিটিং শেষ হলো মারিয়াম? আহা, মা-মেয়ের কী স্বর্গীয় প্রেম! তবে চিন্তা করো না, তোমার মেয়েকে আমি আজ জানালার ওপাশ থেকে যা শিখিয়েছি, ওটা ওর সারাজীবন মনে থাকবে। ও এখন থেকে বুঝবে এই দামী শাড়ি, বড়লোকি চাল আর ধর্মের আড়ালে আসলে রক্ত আর মাংসের আদিম খিদেটাই সবচেয়ে বড় সত্য।"
বলেই সুনিল এক ক্ষুধার্ত ও হিংস্র পশুর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এবার তার সেই হিংস্রতায় এক অন্যরকম মোড় ছিল। সে আমাকে শারীরিক যন্ত্রণার বদলে এক বীভৎস, তীব্র এবং অসহ্য 'আদর আর সোহাগে' ভরিয়ে দিতে শুরু করল। তার সেই নোংরা ছোঁয়াগুলো ছিল বিষাক্ত সাপের মতো মসৃণ অথচ দাহ্য। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে মদির গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "তোমার ওই স্বামীটা তো একটা যান্ত্রিক রোবট, ও কী বোঝে তোমার মতো এই আগুনের? ও তো কেবল জানে তোমাকে একটা দামী পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে। আজ আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেব একজন আসল পুরুষ কীভাবে সোহাগ করে, কীভাবে শরীরের ভেতরের ঘুমন্ত নারীত্বকে জাগিয়ে তুলতে হয়।"
সুনিলের সেই উন্মত্ত সোহাগের প্রতিটি নিপুণ পরশে আমি এক অদ্ভুত এবং ভয়ংকর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লাম। একদিকে আমার আজন্মের ধর্মীয় সংস্কার, মাতৃত্বের দহন আর তীব্র ঘৃণা—অন্যদিকে আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র, প্রতিটি স্নায়ু এক নিষিদ্ধ সুখে শিহরিত হচ্ছিল। সুনিলের সেই শক্ত, পেশিবহুল হাতের বেষ্টনীতে আমি নিজেকে অজান্তেই সঁপে দিচ্ছিলাম। তার আঙুলের প্রতিটি স্পর্শ যেখানেই লাগছিল, সেখান থেকেই যেন এক তীব্র আগুনের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল সারা শরীরে। আমার কণ্ঠনালী চিরে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসছিল এক ধরণের অস্পষ্ট এবং ভারী গোঙানি। সেই গোঙানি কি কেবল যন্ত্রণার? নাকি এক দীর্ঘ অতৃপ্তির পর পাওয়া নিষিদ্ধ এবং চরম তৃপ্তির? আমি নিজেও তখন সেই বিভেদ করতে পারছিলাম না।
সুনিলের বুনো স্পর্শে আমার শরীরের গভীরে এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির উদয় হলো, যা গত বিশ বছরে আমার স্বামী কোনোদিন মেটাতে পারেনি। আমার স্বামীর সেই শুকনো এবং যান্ত্রিক স্পর্শের চেয়ে সুনিলের এই পৈশাচিক আদিমতা আমাকে যেন বেশি করে গ্রাস করছিল। আমি মন দিয়ে তাকে ঘৃণা করতে চেয়েও শরীর দিয়ে পারছিলাম না, বরং এক অদৃশ্য এবং অপ্রতিরোধ্য টানে তার আরও কাছাকাছি হওয়ার এক তীব্র বাসনা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছিল। আমার অবচেতন মন যেন বিদ্রোহ করে উঠল আমার নিজেরই বিরুদ্ধে। আমি নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলাম—"সুনিল, আরও... আরও বেশি সুখ দাও আমাকে... আমি আর পারছি না... এই নরকের আগুনে পুড়তে পুড়তে আমি শেষ হতে চাই।"
সুনিলের তামাকের কড়া গন্ধ আর অ্যালকোহলের ঝাপটা মেশানো নিশ্বাস যখন আমার কন্ঠনালীতে আছড়ে পড়ছিল, তখন আমার গোঙানিগুলো আরও তীব্র এবং নিয়মিত হচ্ছিল। আমি এক ধরণের পৈশাচিক নেশায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। আমার শরীর যেন আমার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সুনিলের হাতের খেলনা হয়ে গেছে। সুনিল হাসল—সে আমার এই শরীরী ভাষার পরিবর্তন আর আমার চূড়ান্ত পতনটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল। সে আরও বেপরোয়া হয়ে আমাকে সোহাগের এক উত্তাল এবং কালবোশেখি সাগরে ভাসিয়ে দিল।
আমার মনে হলো, জানালার ওপাশের সেই মেয়ের ঘৃণাভরা দৃষ্টি আর দরজার ওপাশের স্বামীর সেই ভণ্ডামির পাহারা যেন কোনো সুদূর অন্য জগতের অতি তুচ্ছ ঘটনা। এই ঘরের চার দেয়ালের মাঝখানের এই নিষিদ্ধ এবং উত্তপ্ত মুহূর্তটাই যেন এখন মহাবিশ্বের একমাত্র ধ্রুব সত্য। আমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে, প্রতিটি কোষে এক ধরণের অবর্ণনীয় এবং আদিম সুখ খেলা করছিল, যা আমাকে নৈতিকতা আর ধর্মের সব সীমানা ছাড়িয়ে এক অতল অন্ধকারে তলিয়ে নিচ্ছিল।
আমি নিজের অজান্তেই সুনিলকে আরও শক্ত করে জাপ্টে ধরলাম। আমার নখগুলো তার পিঠে বসে যাচ্ছিল, অথচ সেদিকে আমার কোনো খেয়াল ছিল না। আমার মনের কোণে তখন কেবল একটাই পৈশাচিক হাহাকার—এই রাত যেন কোনোদিন শেষ না হয়, এই পৈশাচিক সুখের স্রোত যেন আমাকে চিরতরে ডুবিয়ে নিয়ে যায়। আমি এক অনন্ত এবং পৈশাচিক পিপাসায় সুনিলের সোহাগের মধ্যে ডুবে যেতে চাইছিলাম। প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি যেন নতুন করে সেই নিষিদ্ধ পাপের স্বাদ পাচ্ছিলাম, যা বিষের মতো তিতা হওয়া সত্ত্বেও মধুর মতো মোহনীয় লাগছিল।
আমি সুনিলের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে পাগলের মতো ফিসফিস করে বললাম, "সুনিল, তুমি ঠিক বলেছো... আমার মেয়েও তো তোমারই দাসী হবে। আমি আর ও—আমরা দুজনেই তোমার এই কামনার আগুনে আজীবন দগ্ধ হতে চাই। তুমি আমাদের এই সুখ থেকে বঞ্চিত করো না।"
রাত যত গভীর হচ্ছিল, ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। সুনিলের সেই বুনো এবং হিংস্র সোহাগ আর আমার অতৃপ্ত গোঙানি এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি করছিল। আমি জানতাম আমি সরাসরি নরকের গহ্বরে প্রবেশ করছি, কিন্তু সেই নরকের আগুনটাই যেন আজ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল এবং আকাঙ্ক্ষিত স্বর্গ মনে হচ্ছিল। আমার স্বামীর পাহারার আড়ালে আমি আজ এক নতুন ধর্মের দীক্ষা নিচ্ছিলাম—যে ধর্মের নাম কেবল শরীর আর নিষিদ্ধ লালসা।
[চলবে...]
লেখা: দিপ সিংহ রায়।
গল্পটি কেমন লেগেছে কমেন্ট করে জানাবেন।
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার ও করতে পারেন।
কোন লেখা বা মতামত জানাতে মেইল করতে পারেন।

1 মন্তব্যসমূহ
আপডেট অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। অত্যন্ত উত্তেজনা পূর্ণ।
উত্তরমুছুন