নিষিদ্ধ পাঠ: অবদমিত সুবাস ও আদিম শিহরণ (প্রথম পর্ব )
সেদিন জুম্মার পর থেকেই পুরো বাড়িটায় একটা কেমন যেন থমথমে, ভারী নীরবতা বিরাজ করছিল। উত্তর দিকের বড় জানালটার ভারী পর্দাগুলো টেনে দেওয়া, যার কারণে দুপুরের চড়া আলোটাও ঘরের ভেতর এসে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল।
সাজ্জাদ সাহেব ড্রইংরুমের বড় সোফাটায় হেলান দিয়ে বসে ডানহাতে তসবীহ গুনছিলেন। উনার ঠোঁট দুটো অনবরত নড়ছিল, কিন্তু চোখ দুটো ছিল ঘরের প্রতিটি কোণায়, যেন কোনো অন্যায় বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে কিনা তা দেখার জন্য সদা সতর্ক। উনার কড়া মেজাজ আর গমগমে কণ্ঠস্বর এই চার দেয়ালের ভেতর এক অদৃশ্য ভয়ের দেয়াল তুলে রেখেছিল।
তিনি স্থানীয় বিশাল এক মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক। এলাকায় উনার কথার ওপর কথা বলার সাহস কারও নেই। স্বাভাবিকভাবেই, উনার নিজের বাড়ির নিয়মকানুন লোহার শৃঙ্খলের চেয়েও শক্ত ছিল। এই বাড়িতে উচ্চস্বরে হাসা বারণ, কোনো গানের সুর গুনগুন করা মহাপাপের শামিল, আর পর্দা প্রথার সামান্যতম হেরফের হওয়া মানেই নরকের দরজা খুলে যাওয়া। বাড়ির প্রতিটি আসবাবপত্র, দেওয়ালের রঙ, এমনকি বাতাসের গন্ধের মধ্যেও যেন এক কঠোর অনুশাসনের ছাপ লেগে ছিল।
কিন্তু সেই নিয়মের নিগূঢ়, দমবন্ধ করা অন্ধকারেই বন্দী হয়ে ছটফট করছিল রেহানা বেগম।
বাইশ বছরের এক টইটম্বুর, ভরা যৌবনা তরুণী। যার ডাগর ডাগর কালো চোখ দুটোতে সবসময় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর কৌতূহল খেলা করত। কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে সমাজ আর নিয়মের খাতিরে সবসময় ঢেকে রাখতে হতো কুচকুচে কালো বোরকা আর ভারী কাপড়ের নিকাবের আড়ালে। রেহানার সুউচ্চ শরীরের সুডৌল বাঁকে বাঁকে এখন তীব্র একঘেয়েমি আর অবদমিত কামনার আগুন জ্বলছে। সে যখন একা ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়াত, নিজের শরীরের এই অপরূপ খাঁজগুলো দেখে সে নিজেই শিউরে উঠত।
কিন্তু এই ভরা যৌবনের সমাদর করার মতো কেউ ছিল না। স্বামী সাজ্জাদ সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। ধর্মের কড়াকড়ি, মাদ্রাসার ব্যস্ততা আর বয়সের ভারে উনার কাছে রেহানা ছিল কেবলই এক ঘরোয়া কর্তব্য, রাতের অন্ধকারের এক যান্ত্রিক দায়িত্ব—কোনো তীব্র ভালোবাসা, গভীর উন্মাদনা বা আদিম কামনার পাত্রী নয়। রেহানা প্রতিনিয়ত এক তীব্র অপূর্ণতায় ভুগছিল, এক অদৃশ্য তৃষ্ণায় তার ভেতরটা রোজ পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল।
আসর নামাজের পর সাজ্জাদ সাহেব ওযু শেষ করে ঘরে ঢুকলেন। রেহানাকে সামনে ডেকে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, "রেহানা, তোমার ইংরেজি আর গণিতের বুনিয়াদটা একটু শক্ত করা দরকার। আমি খেয়াল করেছি, মাদ্রাসার হিসাব-নিকাশ বা বাইরের কিছু কাজ করতে গেলে তোমার এই শিক্ষার অভাবটা ধরা পড়ে। আমার মাদ্রাসার জেনারেল সেকশনে যে নতুন শিক্ষক জয়েন করেছে,
সে ছেলেটা খুব মেধাবী, অঙ্কে তার মাথা দারুণ। নাম অর্ক ব্যানার্জী। আজ থেকেই সে তোমাকে পড়াতে আসবে। প্রতি মাগরিবের নামাজের পরেই তোমার পাঠ শুরু হবে। মনে রেখো রেহানা, সে ভিন্নধর্মী হলেও তোমার শিক্ষক। তবে আমাদের পর্দার নিয়ম যেন কঠোর থাকে। সে ড্রইংরুমে বসবে, তুমি পর্দার আড়ালে বা দূরত্ব বজায় রেখে বসবে।"
রেহানা মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে সায় দিল, "জ্বী, আচ্ছা।" কিন্তু উনার সামনে থেকে চলে আসার সময় তার বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত ধক করে উঠল। এক হিন্দু যুবকের কাছে তাকে পড়তে হবে, তাও আবার এই কড়া রক্ষণশীল বাড়িতে!
অর্ক ব্যানার্জী নামটা শোনার পর থেকেই রেহানার মনের গভীর কোণে এক অজানা উত্তেজনার ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল। সে আগে কখনো কোনো পরপুরুষের এত কাছাকাছি দীর্ঘ সময় কাটায়নি, তাও আবার সমবয়সী এক টগবগে যুবক!
ঠিক মাগরিবের নামাজের পর, যখন বাইরের আকাশটা গোধূলির আলো পেরিয়ে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যাচ্ছিল, তখনই কলিংবেলটা তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল।
রেহানা ততক্ষণে নিজের ঘরে গিয়ে একটি নতুন, মসৃণ কালো বোরকা পরে নিয়েছে। নিজের মুখের ওপর টেনে দিয়েছে ঘন কালো নিকাব, যাতে চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখা না যায়। হাতে পরে নিয়েছে কালো সুতোর গ্লাভস। নিজেকে পুরোপুরি এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো সাজিয়ে সে ড্রইংরুমের বড়, কারুকার্য করা পর্দাটার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। সাজ্জাদ সাহেব দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করল অর্ক।
পর্দার সামান্য একটু ফাঁক দিয়ে রেহানা উঁকি দিল। আর যা দেখল, তাতে তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য ওলটপালট হয়ে গেল, নিশ্বাসের গতি স্তব্ধ হয়ে এল।
অর্ক অত্যন্ত সুশ্রী, সুঠাম দেহের এক যুবক। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা, চুলে নিখুঁত ছাঁট, আর পরনে একটি হালকা নীল রঙের ফর্মাল শার্ট ও গাঢ় রঙের ট্রাউজার্স। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, যেখান দিয়ে তার সুগঠিত গলার তরুণ তরুণ চামড়া দেখা যাচ্ছিল।
সাজ্জাদ সাহেবের মাদ্রাসার অন্য সব বয়োবৃদ্ধ, জরাজীর্ণ হুজুরদের চেয়ে সে সম্পূর্ণ আলাদা, এক ভিন্ন জগতের মানুষ। তার হাঁটাচলা, বসার ভঙ্গির মধ্যে এক অদ্ভুত আধুনিকতা, আত্মবিশ্বাস আর তীব্র পুরুষালি তেজ ছিল, যা ক্ষণিকের মধ্যেই সেই নিস্তব্ধ ঘরের বাতাসকে যেন ভারী ও উষ্ণ করে তুলল।
সবচেয়ে বড় কথা, অর্কর শরীর থেকে কোনো সস্তা বা চড়া আতরের গন্ধ আসছিল না। বরং তার শরীর থেকে আসছিল এক নামী-দামী পারফিউমের তীব্র, মাদকতাময় বুনো ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ বাতাসে ভাসতে ভাসতে যখন পর্দার আড়ালে থাকা রেহানার নাসিকারন্ধ্রে পৌঁছাল, তখন রেহানার মনে হলো তার মাথার ভেতরটা কেমন যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি সুপ্ত কোষে এক অদ্ভুত অবশ করা, অবদমিত অনুভূতির সৃষ্টি হলো। সে নিজের অজান্তেই দেয়ালটা শক্ত করে চেপে ধরল।
সাজ্জাদ সাহেব অর্ককে সোফায় বসিয়ে বললেন, "বসুন অর্ক বাবু। এই যে পর্দার ওপাশে আপনার ছাত্রী আছে। আপনি আজ থেকেই ইংরেজি আর গণিতের বেসিকটা শুরু করতে পারেন। আমি কিতাবগুলো গুছিয়ে দিতে বললাম। আসলে আমার একটু মাদ্রাসার জরুরি মিটিং আছে, এখনই বের হতে হবে। এশার নামাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে একটু রাত হবে। আপনি আপনার মতো পড়ান।"
অর্ক ভদ্রতার খাতিরে মাথা নেড়ে বলল, "জ্বী সাজ্জাদ সাহেব, আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারেন। আমি ঠিকমতোই বুঝিয়ে দেবো।"
সাজ্জাদ সাহেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই সদর দরজাটা ভারী শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আর সাথে সাথেই পুরো বিশাল ড্রইংরুমে এক আদিম, নিস্তব্ধ নীরবতা নেমে এল। ঘরের কোণায় থাকা ডিম লাইটের আবছা আলো আর টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আভা মিলে ঘরটাকে কেমন যেন এক রহস্যময় মায়াজালে রূপান্তর করল।
অর্ক সোফায় বসে হাত থেকে দামি লেদারের ব্যাগটা নামাল। সেখান থেকে কয়েকটা নতুন খাতা আর কলম বের করে টেবিলের ওপর রাখল। এরপর তার সেই চশমার আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে নিবদ্ধ হলো সেই পর্দাটার ওপর, যার পেছনে রেহানা দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। অর্কর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত মার্জিত, শান্ত কিন্তু তাতে ছিল এক অদ্ভুত গম্ভীর গভীরতা।
সে ধীরস্থিরে খাতা কলমটা টেবিলের মাঝখানে এগিয়ে দিয়ে বলল, "পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকলে তো অংক বোঝা যাবে না, রেহানা বেগম। আর একটু সামনে এসে বসুন। আলোর সামনে না আসলে তো অন্ধকার দূর করা যায় না, শেখাও যায় না।"
তার মুখের সেই "রেহানা বেগম" ডাকটা রেহানার কানে সাধারণ কোনো শিক্ষকের মতো শোনাল না। রেহানার মনে হলো, সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরের গভীরে এক তীব্র গোপন, নিষিদ্ধ আহ্বান লুকিয়ে আছে। বোরকার নিচে রেহানার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল।
এক অজানা, আদিম কামনার উত্তাপে তার সারা শরীর যেন মোমের মতো গলতে শুরু করল। সে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ধীর পায়ে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। মাথা নিচু করে, ধীর গতিতে এসে টেবিলের ওপাশের সোফাটায় বসল।
অর্ক তার চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে রেহানার নিকাব পরা মুখের দিকে তাকাল। রেহানার মনে হলো, অর্কর সেই এক্স-রে রশির মতো দৃষ্টি যেন কাপড়ের সব দেয়াল ফুঁড়ে তার ভেতরের লুকিয়ে থাকা অবদমিত তৃষ্ণা, যৌবনের হাহাকার এক পলকেই পড়ে ফেলেছে।
অর্কর ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম, এক রহস্যময় মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল, যা রেহানা ছাড়া আর কেউ দেখার ছিল না। অর্ক খাতাটা রেহানার দিকে একটু বাড়িয়ে দিতেই, অসাবধানতাবশত হোক বা ইচ্ছে করেই হোক, দুজনের আঙুল আলতো করে ছুঁয়ে গেল...।
টেবিলের ওপর কাঠের স্তব্ধতা ভেঙে যখন অর্কর উষ্ণ ও শক্ত আঙুল রেহানার নরম হাতকে স্পর্শ করল, তখন রেহানার মনে হলো তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেছে। কড়াকড়ি, লোকলজ্জা আর ধর্মের পর্দার আড়ালে বছরের পর বছর ধরে বন্দি থাকা বাইশ বছরের তৃষ্ণার্ত শরীরটা যেন এই একটা সামান্য ছোঁয়াতেই চাতক পাখির মতো শিউরে উঠল।
রেহানা চমকে উঠে ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিল। তার বুকের ভেতর তখন ড্রামের মতো শব্দ হচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে অর্কর পারফিউমের সেই বুনো, পুরুষালি ঘ্রাণ তার নিশ্বাসের সাথে ফুসফুসের অতল গহ্বরে ঢুকে তাকে মত্ত করে তুলেছে।
অর্ক অবশ্য একদম স্বাভাবিক থাকার ভান করল, যেন কিছুই হয়নি। সে খাতাটা রেহানার দিকে আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে দিয়ে বলল, "দুঃখিত রেহানা বেগম, আসলে খাতাটা দিতে গিয়ে খেয়াল করিনি। তো, আমরা আজ ইংরেজির বেসিক গ্রামার আর গণিতের কিছু সরল সমীকরণ দিয়ে শুরু করব। আপনার স্বামী সাজ্জাদ সাহেব কিন্তু আমাকে বিশেষভাবে বলেছেন যে আপনার বেসিক নাকি খুবই দুর্বল। অঙ্কের হিসাবগুলো আপনাকে ভালো করে শিখতেই হবে।"
রেহানা নিকাবের নিচে নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে চেটে ভিজিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা বের হতে চাচ্ছে না। অনেক কষ্ট করে ভেতরের কাঁপুনি আর হৃদপিণ্ডের ধকধকানি চেপে সে ফিসফিস করে বলল, "জ্বী... আমি অনেকদিন পড়াশোনার বাইরে। আপনি... আপনি যা ভালো বোঝেন, সেভাবেই করান।"
অর্ক একটা দামি জেল কলম হাতে নিয়ে খাতার ওপর খসখস করে লিখতে শুরু করল। সে যখন ইংরেজি গ্রামারের নিয়মগুলো বোঝাচ্ছিল, রেহানা তখন খাতার দিকে তাকিয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি বারেবারে চলে যাচ্ছিল অর্কর দিকে।
অর্কর সুঠাম চওড়া হাত, শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো থাকায় বেরিয়ে থাকা রোমশ ফর্সা বাহু, তার হাতের সুগঠিত শিরাগুলো আর কথা বলার সময় ঠোঁটের সূক্ষ্ম নড়াচড়া—সবকিছু রেহানার অবদমিত মনে এক অন্যরকম প্রলয় সৃষ্টি করছিল।
পঞ্চাশোর্ধ সাজ্জাদ সাহেবের শুষ্ক, খসখসে আর প্রাণহীন ছোঁয়ার বাইরে এই প্রথম কোনো টগবগে, সুদর্শন যুবক তার এত কাছাকাছি বসেছে, যার নিশ্বাসের শব্দও রেহানা শুনতে পাচ্ছে। রেহানার ভেতরের নারীত্ব যেন এক নিষিদ্ধ আনন্দের সাগরে ডুব দিতে চাইল।
কিছুক্ষণ পর অর্ক খাতাটা ঘুরিয়ে রেহানার দিকে দিয়ে একটি সরল অঙ্ক করতে দিল। "এই সমীকরণটা একটু সমাধান করার চেষ্টা করুন তো। দেখি কেমন বুঝলেন।"
রেহানা কাঁপো কাঁপো হাত নিয়ে কলমটা ধরল। সে অঙ্কটা করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু অর্কর সেই তীব্র, শিকারী দৃষ্টি যেন তার নিকাব ফুঁড়ে সরাসরি তার চামড়ার ওপর গিয়ে তীরের মতো বিঁধছিল। অর্ক যেভাবে একদৃষ্টে তার বোরকা ঢাকা শরীরের ওঠানামা লক্ষ্য করছিল, তাতে রেহানার মাথার সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল। চরম উত্তেজনায় আর হাত কাঁপার কারণে সে একটা সহজ যোগ-বিয়োগ ভুল করে বসল।
"না, রেহানা বেগম। এখানে একটু ভুল হচ্ছে," এই বলে অর্ক এবার আর কোনো দূরত্ব বজায় রাখল না। সে নিজের কাঠের চেয়ারটা টেনে রেহানার সোফার একবারে গা ঘেঁষে নিয়ে এল। এতটাই কাছে যে, রেহানার বোরকার কালো মসৃণ কাপড় অর্কর ট্রাউজার্সের শক্ত কাপড়ের সাথে ঘষা খেল।
অর্ক এবার রেহানার ডান হাতের ওপর, যা দিয়ে সে কলম ধরেছিল, নিজের শক্ত, বড় আর উষ্ণ হাতটা রাখল। কলমটা কীভাবে ঘুরাতে হবে আর লাইনের কোন দিক থেকে শুরু করতে হবে—তা দেখানোর বাহানায় সে রেহানার হাতটাকে নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করে ফেলল।
পুরুষালি হাতের সেই সরাসরি উষ্ণ ও শক্ত চাপ রেহানার পাতলা সুতোর গ্লাভস ভেদ করে তার তপ্ত চামড়ায় গিয়ে লাগল। রেহানার নিশ্বাসের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। বোরকার নিচে তার সুউচ্চ বুকটা কামনার উত্তেজনায় কামারশালার হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল।
সে চাইলে হাতটা সরিয়ে নিতে পারত, কিন্তু তার শরীর যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল। হাত সরিয়ে নেওয়ার কোনো শক্তি সে পাচ্ছিল না, নাকি মনে মনে সে নিজেই এই নিষিদ্ধ, পরপুরুষের আদিম ছোঁয়াটা আরও কিছুক্ষণ উপভোগ করতে চাচ্ছিল? বছরের পর বছর ধরে অবদমিত থাকা কামনার লাভার উদগিরণ তখন তার রক্তের প্রতিটা কণিকায় ঢেউ তুলছে।
অর্ক রেহানার বোরকা পরিহিত কাঁধের ওপর নিজের শরীরটা সামান্য ঝুঁকিয়ে দিল। রেহানার কানের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে একদম নিচু, ফিসফিসে স্বরে বলল, "অঙ্কটা কিন্তু মোটেও এত কঠিন নয় রেহানা বেগম... শুধু মনোযোগটা একটু সঠিক জায়গায় দিতে হয়। আপনি কি আমাকে খুব ভয় পাচ্ছেন? নাকি অন্য কিছু হচ্ছে আপনার মনে?"
অর্কের মুখ থেকে নিঃসৃত গরম নিশ্বাস রেহানার কানের পাশে, নিকাবের পাতলা কাপড়ে এসে আছড়ে পড়ল। রেহানা সহ্য করতে না পেরে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। তার চোখের পাতায় তখন কেবলই অর্কর সুঠাম চেহারার ছবি ভাসছে।
ধর্মের কঠিন দেওয়াল, সমাজের লোকলজ্জার ভয় আর স্বামীর কঠোর অনুশাসন একপাশে, আর শরীরের ভেতর তীব্র ক্ষুধার মতো জমে থাকা আদিম কামনার আগুন অন্যপাশে—দুইয়ের লড়াইয়ে রেহানা যেন অর্কর কাছে আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছিল। অর্কর হাতের আঙুলগুলো এবার রেহানার হাতের তালুর ওপর সূক্ষ্মভাবে বৃত্তাকার ঘষা দিতে লাগল, যা রেহানার শরীরের গোপনতম অঙ্গে এক তীব্র শিরশিরে অনুভূতি এনে দিল।
ঠিক তখনই, ড্রইংরুমের দেওয়ালে থাকা পুরোনো বড় ঘড়িটায় টং টং করে এশার আজানের সময় হওয়ার সংকেত বেজে উঠল। এই শব্দটাই যেন রেহানাকে এক মায়াবী সম্মোহন থেকে ধাক্কা দিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। সাজ্জাদ সাহেবের ফেরার সময় আর বেশি বাকি নেই।
অর্ক অত্যন্ত ধীর পায়ে, শান্ত ভঙ্গিতে রেহানার হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। নিজের চেয়ারটা আবার আগের জায়গায় নিয়ে গেল, যেন কিছুই ঘটেনি। তার ঠোঁটের কোণে সেই একই রহস্যময়, বিজয়ী শিকারীর হাসি। সে খাতাটা বন্ধ করতে করতে বলল, "আজকের প্রথম পাঠ এখানেই থাক রেহানা বেগম। আপনার মনোযোগ আজ অঙ্কে ছিল না। আগামী পর্বে আমরা আরও গভীরে যাবো, আরও কঠিন কিছু অধ্যায় আমাদের সমাধান করতে হবে।"
রেহানা কোনোমতে একটা অস্পষ্ট শব্দ করে মাথা নাড়ল। সে কাঁপতে কাঁপতে খাতা-বইগুলো নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে বসল এবং প্রায় দৌড়ে ড্রইংরুম থেকে ভেতরের শোবার ঘরে পালিয়ে গেল।নিজের ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে সে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। তার হাত-পা তখনও কাঁপছিল, বুকটা ধড়ফড় করছিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে কাঁপো কাঁপো হাতে নিজের মুখের নিকাব এবং বোরকাটা শরীর থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলল, তখন সে দেখল—আয়নায় প্রতিফলিত বাইশ বছরের রেহানার পুরো মুখমণ্ডল কামনার তীব্র উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। তার ডাগর চোখ দুটোতে এখন আর কোনো বিষণ্ণতা নেই, সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক নিষিদ্ধ আসক্তির আদিম আগুন।
রেহানা তার নিজের ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরল..............….. চলবে।
"গল্পটি আপনার কেমন লাগছে? কমেন্টে জানান। আপনার একটি মন্তব্য আমাকে নতুন পর্ব লিখতে উৎসাহ জোগাবে।"
"সতর্কবার্তা: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা বিশ্বাসের সাথে এর মিল থাকলে তা কেবলই কাকতালীয়। এটি কেবল প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের বিনোদনের জন্য রচিত।"
লেখা: দিপ সিংহ রায়।

0 মন্তব্যসমূহ