ভোরের হালকা কুয়াশা আর নরম আলো যখন মাদ্রাসার মেইন গেটের ওপর এসে পড়ল, তখন চারপাশের পরিবেশটা ছিল একদম শান্ত। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত দারোয়ান রহমান চাচা ওনার চিরচেনা লাঠিটা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সারারাত ডিউটি শেষে অয়ন ভেতর থেকে মেইন গেটের ভারী তালাটা শব্দ করে খুলল। গেটটা সামান্য ফাঁক করে ওনাকে দেখে একটা স্বাভাবিক ও বিনীত হাসি দিল সে। তবে ওনার চোখের কোণে লেগে থাকা লালচে ভাব আর চেহারার ক্লান্তিটা পুরোপুরি ঢাকা যাচ্ছিল না।
রহমান চাচা ওনার দিকে একটু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সরল মনে বললেন, "কী রে অয়ন, চোখ-মুখ তো শুকাইয়া গেছে একদম! রাতে ঘুমাস নাই ঠিকমতো? শরীর খারাপ নাকি?"
অয়ন খুব বাধ্য ছেলের মতো মাথা চুলকে বিনীত গলায় বলল, "না চাচা, শরীর ঠিক আছে। আসলে বড় ম্যাডাম কিছু জরুরি হিসাবের খাতা দেখতে দিছিলেন। ওগুলা ওলটপালট ছিল, তাই মিলাইতে মিলাইতেই রাত পার হয়ে গেল। আপনি এখন ডিউটি বুঝে নেন, আমি মেসে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দেব। দুপুরের আগে আর উঠতে পারব না।"
রহমান চাচা ওনার পিঠে পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে বললেন, "আচ্ছা যা, সাবধানে যা। এই বয়সে শরীরের ওপর এতো ধকল দেওয়া ঠিক না। মাদ্রাসার কাজ তো থাকবেই, নিজের দিকেও খেয়াল রাখিস।"
রহমান চাচা ওনার সরল মনে অয়নের এই দায়িত্বশীলতা দেখে মনে মনে বেশ খুশিই হলেন। ওনার বিন্দুমাত্র ধারণা হলো না যে, ওনার এই সরল বিশ্বাসের আড়ালে অয়ন মাদ্রাসার অন্দরমহলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে।
মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে অয়ন দ্রুতপায়ে ওনার মেসের দিকে রওনা দিল। সকালের ঠাণ্ডা বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে ওনার মনে হলো, আয়েশা আর সফুরা খাতুনের মতো প্রভাবশালী ও পর্দানশীল নারীদের ওপর একা আধিপত্য বজায় রাখা বা ওনাদের সবসময় সামলানো ওনার একার পক্ষে কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া ম্যাডামরা যদি ওনার ওপর পাল্টা কোনো চাল চালেন বা সামাজিকভাবে ওনাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন, সেই ভয়ও ওনাকে কিছুটা তাড়া করছিল। নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে এবং এই খেলায় নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে সে ওনার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু—সৌমিক দত্ত এবং সাগর বনিককে ফোন করে জরুরি ভিত্তিতে ওনার মেসে ডেকে পাঠাল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওনার দুই বন্ধু আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে মেসের ঘরে এসে হাজির হলো। ওনারা আসতেই অয়ন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঘরের দরজা-জানালা সব ভালো করে বন্ধ করে দিল, যাতে ওনাদের ব্যক্তিগত কথাবার্তা বাইরে অন্য কোনো মেস মেম্বার শুনতে না পারে।
মেসের সেই বন্ধ ঘরে চা বানাতে বানাতে অয়ন ওনাদের দুজনের সামনে মাদ্রাসার ভেতরের পুরো পরিস্থিতি এবং শিক্ষিকাদের বশ করার সেই গোপন ভিডিওর কথা একদম খুলে বলল। অয়নের মুখে এমন প্রভাবশালী ও পর্দানশীল নারীদের ওপর আধিপত্য খাটানোর এবং ওনাদের ভয় দেখিয়ে নিজেদের আড্ডার খরচ ও লোভ-লালসা মেটানোর এই সুযোগের কথা শুনে সৌমিক আর সাগরের চোখ চকচক করে উঠল। ওনারা অয়নের এই ব্যক্তিগত চক্রান্তের অংশীদার হতে এক পায়ে রাজি হয়ে গেল।
খুশিতে আত্মহারা হয়ে সৌমিক অয়নের পিঠ চাপড়ে বলল, "আরে ধুর দোস্ত! তোরে আর এই ভাঙা মেসে কষ্ট করে টাকা দিয়ে থাকতে হবে না। মিস্ত্রী পাড়ায় আমাদের যে বাড়িটা ভাড়ার জন্য খালি পড়ে আছে, আজই তুই মেস ছেড়ে ওখানে গিয়ে উঠবি। তোর থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া লাগবে লাগবে না, একদম ফ্রিতে থাকবি। বিনিময়ে আমাদের এই পুরো মালের পার্টনার বানায় নে, যেন আমরাও মাঝেমধ্যে একটু মজা উড়াইতে পারি।"
সাগরও পাশ থেকে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, "একদম ঠিক কথা। ওখানে থাকলে আমাদের আড্ডা দিতেও সুবিধা হবে, আর ম্যাডামদের ওপর কীভাবে চাপ ধরে রাখতে হবে, সেই বুদ্ধিও আমরা একসাথে বসে দিতে পারব।"
অয়ন আর দেরি করল না। দুপুরের মধ্যেই সে ওনার মেসের বিছানা-পত্র আর কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে নিল। মেস মালিকের পাওনা চুকিয়ে দিয়ে সে সৌমিকের দেওয়া চাবি নিয়ে সোজা মিস্ত্রী পাড়ার সেই ছিমছাম আর ফাঁকা বাড়িটিতে গিয়ে উঠল। বাসাটা বেশ খোলামেলা, নিরিবিলি আর আরামদায়ক ছিল।
বিকালে সৌমিক আর সাগর ওনার নতুন বাসায় মিষ্টি, চানাচুর আর আড্ডার জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হলো। তিন বন্ধু মিলে নতুন বাসার বারান্দায় প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসে চা খেতে খেতে হালকা চালে হাসাহাসি আর গল্প করতে লাগল। তারা নিজেদের মতো করে আয়েশা আর সফুরা ম্যাডামদের ব্ল্যাকমেইল করার সাধারণ ছক সাজাতে লাগল, যেন ওনারা কোনোভাবেই অয়নের হাত থেকে নিষ্কৃতি না পান এবং ওনাদের বন্ধুদের সব আবদার ও আর্থিক সুবিধা দিতে বাধ্য হন।
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। অয়নের এবার মাদ্রাসার রাতের ডিউটিতে যাওয়ার সময় হলো। সে ওনার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নতুন বাসার তালা মেরে মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
সন্ধ্যায় যখন অয়ন মাদ্রাসার মেইন গেটে পৌঁছাল, তখন রহমান চাচা ওনার রাতের ডিউটি শেষ করে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অয়নকে গেটের সামনে দেখে রহমান চাচা হাসিমুখে বললেন, "কী রে অয়ন, ঘুম হইছে ঠিকঠাক? এখন শরীর কেমন লাগে?"
অয়ন ওনার ব্যাগটা একপাশে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, "হাঁ চাচা, ঘুম ভালোই হইছে। আর একটা কথা চাচা, আমি দুপুরের দিকে আমার ওই পুরোনো মেসটা ছেড়ে দিছি। মেসে বড্ড চিল্লাচিল্লি হতো, পড়াশোনা বা কাজের মনোযোগ থাকতো না। তাই মিস্ত্রী পাড়ার দিকে একটা সাধারণ আর শান্ত ছিমছাম বাসায় উঠছি। এখন থেকে ওখানেই থাকব।"
রহমান চাচা ওনার কথায় একটুও সন্দেহ না করে মাথা নেড়ে বললেন, "ভালোই করছিস বাবা। মেস-বাড়িতে জগাখিচুড়ি অবস্থা থাকে। শান্ত জায়গায় থাকলে শরীর-মন দুই-ই ভালো থাকবে। চল, আমি তাহলে আজকের মতো আসি, তুই গেটটা ভালো করে লক করে দিস।"
রহমান চাচা লাঠি ঠুকে অন্ধকারের মধ্যে বাড়ির পথ ধরলেন। অয়ন মেইন গেটের ভারী তালাটা আটকে দিয়ে ওনার পকেটে হাত দিল। পকেটে তখন মিস্ত্রী পাড়ার নতুন বাসার চাবি আর বন্ধুদের সাথে করা সন্ধ্যার সেই চক্রান্তের রেশ। সে মনে মনে ক্রূর হেসে মাদ্রাসার ভেতরের অন্ধকারের দিকে তাকাল—যেখানে আয়েশা আর সফুরারা ওনার জন্য অপেক্ষা করছে।
[চলবে....]
লেখা: দিপ সিংহ রায়।
💬 প্রিয় পাঠক, মিস্ত্রী পাড়ার নতুন বাসায় সৌমিক আর সাগরের সাথে হাত মেলানোর পর, অয়নের আত্মবিশ্বাস এখন আরও তুঙ্গে। "মাদ্রাসার অন্দরমহল" গল্পের আগামী পর্বে অয়ন যখন আয়েশা আর সফুরা ম্যাডামের সামনে ওনার বন্ধুদের নতুন আবদার তুলে ধরবে, তখন কী ঘটবে? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত জানান!

0 মন্তব্যসমূহ