অফিস কক্ষের ভেতর অয়ন কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। সফুরা আর রোকসানার এই নিথর ও বিধ্বস্ত দেহগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে এক অদ্ভূত বিকৃত তৃপ্তি কাজ করছে। সে ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল এবং খুব সাবধানে দরজার কপাটটা বন্ধ করে দিল। বাইরে করিডোরে তখনো নিঝুম অন্ধকার, মাদ্রাসার ভেতরে কেবল তাদের কামনার অবশিষ্টাংশটুকু দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝুলে আছে। অয়ন দরজাটা ভেতর থেকে চাপিয়ে দিয়ে সাঙ্কেতিক একটা শব্দ করল, যেন বাইরের কেউ বুঝতে না পারে ভেতরে ঠিক কী ঘটেছে।
সে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাদ্রাসার প্রধান গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। সাগর আর সৌমিক তখনো কামের নেশায় মাতাল, অয়নের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দিল। অয়ন ইশারায় ওদের দুজনকে চলে যেতে বলল। সাগর আর সৌমিক কোনো কথা না বাড়িয়ে মাদ্রাসার প্রাচীর টপকে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল। ওরা দুজনে চলে যাওয়ায় অয়ন এখন একা। সে মেইন গেটের কাছে পাহারায় বসল। ওর হাতে একটা লাঠি, চোখেমুখে এক সতর্ক পিশাচের ভাব।
ভোর হওয়ার আর খুব বেশি দেরি নেই। আকাশের কোণে হালকা ধোঁয়াটে আলো ফুটে উঠছে। অয়ন মেইন গেটের হুড়কোটা আঁকড়ে ধরে বাইরের জগতের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মাথায় তখনো সেই বীভৎস দৃশ্যগুলো ঘুরছে—সফুরা আর রোকসানার ওই বেশামাল দেহগুলো। অয়ন বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলল, "আজ রাতে যা হলো, তার কথা জানলে এই মাদ্রাসার নামগন্ধ থাকবে না। এদের দুজনের সামাজিক সম্মান আর জীবন—সব আজ আমার হাতের মুঠোয়। এখন থেকে এই মাদ্রাসা শুধু নামেই মাদ্রাসা, আসল মালিক এখন আমরাই।"
অয়নের মনে তখন এক নতুন শয়তানি খেলা শুরু হয়েছে। সকাল হলে যখন মানুষ আসবে, তখন এই দুই শিক্ষিকা কী করবেন? তারা কি মুখ খুলতে পারবেন? নাকি অয়নের এই পৈশাচিক হুমকির মুখে তারা চিরদিনের মতো বোবা হয়ে যাবেন? অয়ন গেটের ওপর হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ভোরের সেই হালকা আলোয় অয়নের চেহারাটা যেন কোনো নরকের দূতের মতো দেখাচ্ছে।
ভেতরের কক্ষ থেকে তখনো ভেসে আসছে সফুরার সেই অস্ফুট গোঙানির শব্দ। সফুরা কি এখনো জেগে আছেন? রোকসানা কি একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করছেন? অয়ন ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ক্রূর হাসি হাসল। সে জানে, এই রাতের পর থেকে সফুরা আর রোকসানার জীবনে আর কোনো সকাল আসবে না। তারা এখন চিরস্থায়ীভাবে অয়নের ক্রীতদাসীতে পরিণত হয়েছে। অয়ন গেটের পাহারা দিচ্ছে, আর ভেতরে দুই নারী তাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও বীভৎস রাতের যবনিকাপাতে নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন।
রাত শেষ হয়ে আসছে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দূর থেকে মসজিদের আজানের শব্দ ভেসে আসছে, যা স্বাভাবিক জীবনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঠিক সেই সময় রহমান চাচা মাদ্রাসার গেটে এসে হাজির হলেন। রহমান চাচা নিজের ডিউটি বুঝে নিলেন। তিনি গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন, চারপাশে স্বাভাবিক দিনের কর্মব্যস্ততার আমেজ ফিরছে।
সকাল সাতটা বাজার সাথে সাথে মাদ্রাসার বেল বেজে উঠল। ছাত্রদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল প্রাঙ্গণ। প্রতিদিনের মতো ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা একে একে তাদের ক্লাসে যেতে শুরু করলেন। অথচ সফুরা আর রোকসানার রুমের দরজাটা তখনো ভিতর থেকে বন্ধ। বাইরে থেকে কেউ হয়তো বুঝতেও পারল না, এই দরজার আড়ালে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে কী পৈশাচিক কাহিনী ঘটে গেছে।
এদিকে অয়ন যখন দেখল রহমান চাচা ডিউটি বুঝে নিয়েছে, সে তখন নিঃশব্দে মাদ্রাসার সীমানা ত্যাগ করল। ক্লান্ত শরীরে সে বাসার দিকে হাঁটা শুরু করল। বাসায় পৌঁছে তার চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভূত শীতলতা। তার সারা শরীরে এখনো ওই বীভৎস রাতের কামনার গন্ধ লেগে আছে। সে দ্রুত কাপড় বদলে ফ্রেস হয়ে নিল, যেন তার ওপর দিয়ে কিছুই যায়নি। শোবার ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই তার দুই চোখ ঘুমে ভারী হয়ে এল। অয়ন নিশ্চিত, সকালে যখন সফুরা আর রোকসানা চোখ খুলবে, তখন তাদের জগৎটাই অন্যরকম হয়ে যাবে—আর সেই জগৎটা এখন পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে। সে এক গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল, যেন এক বিশাল জয় শেষে এক লম্পট পিশাচ বিশ্রাম নিচ্ছে।
[চলবে...]

0 মন্তব্যসমূহ