আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (১ম পর্ব)
এই গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক। সমাজের কিছু মানুষের দ্বিমুখী আচরণ এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ফুটিয়ে তোলাই লেখকের মূল উদ্দেশ্য। কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা গল্পের লক্ষ্য নয়।"
আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (১ম পর্ব)
আমাদের সাদা ধবধবে সাজানো সংসারটা ছিল এক পবিত্রতার মূর্ত প্রতীক। বাইরের মানুষ আমাদের দিকে তাকালে শ্রদ্ধা আর শ্রদ্ধায় নুইয়ে আসত। আমার স্বামী একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মপরায়ণ ব্যবসায়ী, যার দিন শুরু হয় ফজরের তসবিহ আর কোরআন তিলাওয়াতের শান্ত সুরে।
আমাদের দুই মেয়ে—ছোটজন কোরআনের হাফেজা আর বড়জন আলেমা। আমাদের বাড়ির বাতাস সবসময় লোবান আর আতরের এক আধ্যাত্মিক সুবাসে মৌ মৌ করত। কিন্তু কেউ জানত না, এই পবিত্রতার সুনিপুণ আবরণের নিচেই এক পৈশাচিক আঁধার আর বীভৎস সত্য তিল তিল করে বেড়ে উঠছে।
উইকেন্ডের সেই বিকেলটা অন্যদিনের মতোই শান্ত ছিল। মেয়েরা তখন ওপরতলায় মাদ্রাসার কিতাব নিয়ে গভীর মগ্ন। আমার স্বামী আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি গুমোট, গম্ভীর। কিন্তু তার শান্ত চেহারার পেছনে চোখের কোণে এক অদ্ভুত, কুটিল হাসি আমি ঠিকই টের পাচ্ছিলাম।
আজ আমাদের বাড়িতে বিশেষ এক মেহমান আসার কথা—সুনিল কান্তি দাস। সে কেবল আমার স্বামীর ব্যবসার বিশ্বস্ত সরকারি হিসাবরক্ষকই নয়, সে আমাদের এই নিষিদ্ধ অন্ধকার জগতের সবচেয়ে পুরনো এবং ধুরন্ধর খেলোয়াড়।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে যখন চারদিকে মাগরিব আর এশার আজান ভেসে আসছিল, তখন আমাদের ড্রয়িংরুমের সেই ভারী মখমলের পর্দার ওপাশে অন্য এক বীভৎস আয়োজন চলছিল। যে লোকটা দিনের আলোয় তসবিহ হাতে ব্যবসার তদারকি করে আর ধর্মপ্রচারের বয়ান দেয়,
সেই মানুষটাই রাতের ঘন আঁধারে নিজের হাতে আমার জন্য দামী মদের গ্লাস সাজিয়ে দেয়। আমার স্বামী আর সুনিল যখন পাশাপাশি বসে কুৎসিত আলোচনায় মেতে ওঠে, তখন আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এক বিষাক্ত শিহরণ জাগে।
আমার আভিজাত্যের শেষ মুখোশটাও তখন ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে যায়।
বছরের পর বছর ধরে আমার স্বামী নিজেই আমাকে তিলে তিলে এই নরকের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সে নিজেই আমাকে সুনিল কান্তির কামনার হাতে তুলে দিয়েছে। শুরুতে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষের এই চরম দ্বিমুখী রূপ দেখে আমি শিউরে উঠতাম, ঘৃণায় নিজেকে শেষ করে দিতে চাইতাম।
কিন্তু এখন? এখন এটাই আমার এক অদ্ভুত নেশা। যখন সে তার নিজের বিশ্বস্ত কর্মীর সাথে আমাকে নিবিড় হতে দেখে এক পৈশাচিক আনন্দ পায়, তখন আমার মনে হয়—ধর্ম, নীতি আর নৈতিকতা কেবল বাইরের সাধারণ মানুষদের জন্য; এই চার দেয়ালের ভেতরে আমরা সবাই একেকটা আদিম, রক্তপিপাসু জানোয়ার।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশ তখন গুমোট হয়ে এসেছে। সুনিল কান্তির চতুর চোখের লালসাভরা চাহনি আর আমার স্বামীর নীরব ইশারায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আমার স্বামী হঠাৎ ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এক বিজাতীয় বিজয়ের তৃপ্তি। সে সুনিলের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "সুনিল দা, মারিয়াম এখন পুরোপুরি তৈরি। আজকের রাতটা কেবল তোমার আর ওর!"
আমরা নিচতলার সেই নিভৃত গেস্টরুমের দিকে এগোলাম। যে বাড়ির একটি ঘরে আমার ছোট মেয়েটি পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো মুখস্থ করে, ঠিক সেই বাড়িরই অন্য এক অন্ধকার কোণে আমি আর সুনিল লিপ্ত হই এক নিষিদ্ধ, আদিম খেলায়। আমার স্বামী তখন বাইরে বসে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেয়। তার একমাত্র লক্ষ্য—তার তথাকথিত 'ধর্মপরায়ণ' ভাবমূর্তি আর নিজের পবিত্র মেয়েদের কানে যেন কোনোভাবেই এই পাপের আর্তনাদ বা শব্দ না পৌঁছায়।
আমি তখন সুনিলের কামনার অতল গহ্বরে ডুব দিচ্ছিলাম। কিন্তু আমার অবচেতন মনের এক কোণে বারবার একটা আশঙ্কার ঘণ্টা বাজছিল—এই যে মুখোশ আমরা পরে আছি, তা কি সারাজীবন টিকে থাকবে? পবিত্রতার এই বিশাল মিনারের নিচে আমরা যে পাপের পাহাড় জমিয়েছি, তা যদি কোনোদিন ভেঙে পড়ে, তবে আমাদের ক্ষমা করার মতো জায়গা কি এই পৃথিবীতে থাকবে?
[চলবে...]
লেখা: দিপ সিংহ রায়।
আপনার মূল্যবান মন্তব্য নিচে লিখে জানান। আপনাদের উৎসাহ পেলে দ্রুতই নিয়ে আসব "আড়ালের অন্ধকার"-এর পরবর্তী রোমাঞ্চকর পর্ব। "ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।"

2 মন্তব্যসমূহ
দারুন। চালিয়ে যান।
উত্তরমুছুনআপডেট চাই। অনেক সুন্দর হচ্ছে। এই নিষিদ্ধ শোক পাঠক হিসেবে আমার শরীরের রন্ধে রন্ধ্রেও জেগে উঠছে।
উত্তরমুছুন