আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (২য় পর্ব)
গেস্টরুমের ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা যখন আমার স্বামী বাইরে থেকে টেনে দিলেন, তখন এক অদ্ভুত শুকনো ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ হলো। সেই শব্দটা যেন আমার হৃৎপিণ্ডের মাঝখান দিয়ে একটা ধারালো করাতের মতো চলে গেল। দরজার ওপাশে ভারী ছিটকিনি পড়ার শব্দটা আমার কানে শোনাল কোনো এক প্রাচীন বন্দিশালার তালা লাগানোর মতো। আমি জানি, এই ছিটকিনিটা আমাকে রক্ষা করার জন্য নয়, বরং আমাকে এক নিষিদ্ধ নরকের ভেতর নিঃশব্দে আটকে ফেলার জন্য লাগানো হয়েছে।
ড্রয়িংরুমে তখনো সন্ধ্যার ধূপ আর লোবানের হালকা সুবাস অবশিষ্ট ছিল, যা আমার স্বামী অত্যন্ত যত্ন করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে বাইরের লোক আমাদের বাড়ির ‘পবিত্রতা’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে। অথচ এই বন্ধ ঘরের ভেতরে সেই সুবাস ছাপিয়ে এক উগ্র, কটু গন্ধ আমার নাকে ঝাপটা মারল। এটা দামী বিদেশি পানীয় আর এক অচেনা পুরুষের গায়ের সস্তা ঘাম ও পারফিউমের এক অদ্ভুত মিশেল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বোরকার ভেতর আমি ঘামছিলাম, কিন্তু সেই ঘাম গরমে নয়, এক তীব্র আতঙ্কে।
সুনিল কান্তি দাস। আমাদের পারিবারিক ব্যবসার সরকারি খাতা-পত্রের প্রধান হিসাবরক্ষক। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই লোকটাকে। পরনে সবসময় ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, কপালে চন্দন বা সিঁদুরের তিলক, আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বাইরে তাকে দেখলে যে কেউ মনে করবে সে অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী এবং দেবতুল্য একজন মানুষ। কিন্তু আজ এই আধা-অন্ধকার ঘরে তার সেই বিনয়ের মুখোশটা পুরোপুরি খসে পড়েছে। তার চোখের মনিতে এক বিজাতীয় লালসা দাউদাউ করে জ্বলছে, যা এর আগে আমি কোনোদিন দেখিনি।
সে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। বরফ আর পানীয়ের ঠোকাঠুকিতে একটা অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হচ্ছিল, যা নিস্তব্ধ ঘরটায় এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছিল। সুনিল গ্লাসটা শব্দ করে নামিয়ে রেখে আমার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আমার সম্মানের ওপর এক একটি পদাঘাত।
আমার স্বামী দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন—যিনি এই বাড়ির সর্বেসর্বা, যিনি আমার সন্তানদের আদর্শ বাবা, যিনি সমাজের চোখে একজন পরহেজগার মানুষ। অথচ তিনিই আজ নিজের ব্যবসার গদি রক্ষা করতে, কয়েকটা সরকারি লাইসেন্স আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার নেশায় নিজের স্ত্রীকে এক ক্ষুধার্ত নেকড়ের খাঁচায় ঠেলে দিয়েছেন। আজ তার সেই লম্বা তসবিহ আর পবিত্র বুলিগুলো কোথায় হারিয়ে গেল? নাকি এই অন্ধকারটাই তার আসল জগত?
সুনিল আমার খুব কাছে এসে থামল। তার নিশ্বাসে তামাক আর কড়া অ্যালকোহলের মিশ্রিত এক দমবন্ধ করা গন্ধ। সে নিচু স্বরে হাসল—যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল এক ধরণের পৈশাচিক বিজয়।
"কী হলো মারিয়াম? আজ কি খুব বেশি ভয় পাচ্ছো? নাকি তোমার পরহেজগার সাহেব আজ পাহারা দিতে গিয়ে বেশি কড়াকড়ি করছে?"—সুনিলের কণ্ঠে এক ধরণের বিষাক্ত শ্লেষ।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। আমার গলার কাছে এক দলা কান্না আর তীব্র ঘৃণা আটকে ছিল। আমি শুধু ভাবছিলাম, এই যে হিজাব আর বোরকায় নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছি, এটা কি আব্রু রক্ষার জন্য? নাকি আমার স্বামীর এই বীভৎস সত্যিটা পৃথিবীর কাছে আড়াল করার জন্য?
সুনিল আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। তার হাতটা আমার বোরকার হাতার ওপর দিয়ে আমার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল। আমি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম, কিন্তু চিৎকার করার সাহস পেলাম না। তার স্পর্শে যেন শত শত বিষাক্ত বিচ্ছু আমার শরীরে কামড়ে ধরল। সুনিল ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, "তোমার সাহেব মানুষটা বড়ই বিচিত্র, মারিয়াম। সে নিজে বাইরে তসবিহ গুনে পাহারা দিচ্ছে যাতে কেউ এই ঘরে উঁকি না দেয়, আর ভেতরে তোমাকে সে খুশিমনে আমার হাতে সঁপে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে ভাবি, ধর্ম আর নীতি কি কেবল তার জিহ্বার আগায় থাকে? নাকি সে আসলে আমার মতোই একজন পাপিষ্ঠ, যে কেবল সমাজের সামনে সাদা মুখোশ পরে থাকতে ভালোবাসে?"
এই কথাগুলো আমার বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সুনিল ভুল কিছু বলেনি। আমার স্বামী যখন সুনিলের কাছ থেকে ব্যবসার বড় কোনো ডিল বা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার নথিপত্রের সুবিধা নেন, তখন বিনিময়ে তিনি আমাকে ‘উপহার’ হিসেবে পাঠিয়ে দেন। আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা এই পণ্যটির মূল্য কেবল কয়েক কোটি টাকার ব্যবসায়িক মুনাফা।
ঘরের এক কোণে থাকা ল্যাম্পের মৃদু হলদেটে আলোয় সুনিলের ছায়াটা দেয়ালে বিশাল এক রাক্ষসের মতো দেখাচ্ছিল। সে হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল। তার আঙুলগুলো আমার নেকাবের প্রান্তটা খামচে ধরল।
"চুপ করে থেকো না মারিয়াম! তোমার এই নীরবতা আমাকে আরও বেশি ক্ষুধার্ত করে তোলে। তোমার স্বামী তো বাইরের সোফায় বসে আছে তার তথাকথিত ইবাদত নিয়ে, তাকে নিয়ে একদম চিন্তা করো না। সে নিজেই চায় আমি তোমাকে আজ ইচ্ছেমতো ব্যবহার করি।"
সুনিলের কণ্ঠস্বর এবার বদলে গেল। আগের সেই ভদ্রলোক হিসাবরক্ষক সুনিল আর এই কামুক সুনিলের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সে আমার হিজাবটা হ্যাঁচকা টানে আলগা করে দিল। আমি আর্তনাদ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সে তার এক হাত দিয়ে আমার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল।
"খবরদার! একটা শব্দও করবে না। তোমার সাহেবকে তো চেনো? একটা আওয়াজ বাইরে গেলে সে তোমাকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলবে তার সম্মানের খাতিরে। তার কাছে তার ভাবমূর্তি তোমার প্রাণের চেয়েও দামী।"
সুনিলের এই আক্রমণাত্মক আচরণ আমাকে শিউরে দিচ্ছিল। সে আমাকে বিছানার দিকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করল। তার ভেতরে এক ধরণের আদিম জানোয়ার জেগে উঠেছে। সে জানে, এই বাড়িতে সে আজ অপ্রতিরোধ্য।
ঠিক সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের মাঝখানে, জানালার কাঁচের ওপাশে একটা আবছা ছায়া নড়ে উঠল।
আমি আর সুনিল—দুজনেই মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলাম। সুনিল জানালার দিকে তাকিয়ে তার ধূর্ত ভ্রু কুঁচকাল। তার চোখে এক পলকের জন্য ভয়ের ছায়া খেলে গেল। বাইরে কি কেউ আছে? আমার স্বামী তো মেইন দরজায় আর ড্রয়িংরুমে পাহারা দিচ্ছেন, তবে বাড়ির পেছনের এই ঝোপঝাড়ের মাঝখানে জানালার কাছে এই গভীর রাতে কে এল?
সুনিল আমাকে ছেড়ে দিয়ে ধীর পায়ে জানালার দিকে এগুলো। পর্দার সামান্য ফাঁক দিয়ে সে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করল। বাইরে তখন অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। কিন্তু সেই খসখসে শব্দটা আবার হলো। যেন কেউ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে। জানালার কাঁচের ওপর কেউ একজন হাত রাখল—একজোড়া স্থির চোখ যেন অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আমাদের এই পাপের রাজ্যটা দেখার চেষ্টা করছে।
কে ও? তবে কি আমাদের এই সুনিপুণভাবে সাজানো মিথ্যার দুর্গ আজই ভেঙে পড়বে? আড়ালে থাকা সেই অদৃশ্য চোখ কি আমাদের এই বীভৎস সত্যের সাক্ষী হয়ে গেল? সুনিল জানালার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে গেল, আর আমি আতঙ্কে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
[চলবে...]
লেখা: দিপ সিংহ রায়।

0 মন্তব্যসমূহ