সন্ন্যাসীর থান: অলৌকিক বরদান (প্রথম পর্ব)

 সন্ন্যাসীর থান: অলৌকিক বরদান || প্রথম পর্ব: অর্জুনের ডায়েরি ও বন্ধ্যা নারীর কান্না

Dip's Dark Story


গ্রামের একদম শেষ সীমানায়, যেখানে লোকালয় শেষ হয়ে ঘন জঙ্গল আর নদীর পুরনো খাত শুরু হয়েছে, ঠিক সেখানেই ‘ভৈরব সন্ন্যাসীর’ থান। লোকমুখে প্রচলিত, এই থান প্রায় তিনশ বছরের পুরনো। এক বিশাল বটগাছ ডালপালা ছড়িয়ে পুরো এলাকাটাকে যেন অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। 

গাছটির ঝুরিগুলো মাটি ছুঁয়ে অদ্ভুত সব আকৃতি তৈরি করেছে, যা গোধূলির আলোয় দেখলে মনে হয় কোনো কঙ্কালসার হাত মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে। দিনের বেলাতেও সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে কুন্ঠিত হয়। সেই ছমছমে পরিবেশের মাঝে একটি মাঝারি উচ্চতার সমাধি, যা লাল কাপড়ে ঢাকা। আর সেই সমাধির দেখভাল করে অর্জুন।

অর্জুন মানুষটা এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের মতো নয়। তার দীর্ঘ গড়ন, চওড়া কাঁধ আর কাঁধ অবধি লম্বা জট পাকানো চুল তাকে এক প্রকার আদিম সৌন্দর্য দিয়েছে। তার চোখের মণি দুটো অস্বাভাবিক কালো, যেন অগাধ কোনো কুয়া। অর্জুন খুব কম কথা বলে। গ্রামের মানুষ তাকে যমের মতো ভয় পায়, আবার দেবতাতুল্য ভক্তিও করে। 

জনশ্রুতি আছে, অর্জুন নাকি মানুষের চোখের দিকে তাকালে তার সাত জন্মের পাপ-পুণ্য বলে দিতে পারে। এই থানে যারা আসে, তারা সবাই সমাজের প্রান্তিক এবং অসহায় মানুষ, বিশেষ করে সেই সব নারীরা, যারা ভাগ্যের কাছে মার খেয়ে শেষ আশ্রয় খুঁজতে আসে।

সেদিন বিকেলের আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকম রক্তবর্ণ। দক্ষিণের দিঘি থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস বটগাছের পাতায় লেগে এক ধরণের শোঁ শোঁ শব্দ তুলছিল। ঠিক সেই সময় একদল বোরকা পরা নারী থানের আঙিনায় এসে পা রাখল। তাদের প্রত্যেকের চলাফেরা এবং শরীরের ভাষায় এক ধরণের অপরাধবোধ আর আতঙ্ক মাখা ছিল। এই দলটির মধ্যমণি হয়ে হাঁটছিল ফরিদা।

ফরিদা এই গ্রামেরই বউ। বয়স পঁচিশের কোঠায় হলেও তার চেহারায় অকাল বার্ধক্যের ছাপ। বিয়ের পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও তার কোল আলো করে কোনো সন্তান আসেনি। আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন নারীর যখন সন্তান হয় না, তখন তাকে 'অপয়া' বা 'আঁটকুড়ি'র তকমা সইতে হয়। 

ফরিদার অবস্থা আরও করুণ; তার স্বামী করিম প্রায়ই মদ্যপ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তাকে মারধর করে এবং নতুন বিয়ের হুমকি দেয়। শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনা আর সমাজের টিটকারি সইতে সইতে ফরিদা আজন্ম এক হাহাকার নিয়ে এই হিন্দু সন্ন্যাসীর থানে এসেছে। যদিও তার ধর্ম মতে এসব জায়গায় আসা নিষেধ, কিন্তু ডুবে যাওয়া মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, ফরিদার কাছেও অর্জুন এখন সেই শেষ খড়কুটো।

অর্জুন তখন থানের বেদিতে বসে রূপোর বাটিতে ধূপ দিচ্ছিল। ধূপের সেই তীব্র, নেশা ধরানো আর মাদকতাময় গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। ফরিদা যখন কাঁপাকাঁপা পায়ে অর্জুনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, অর্জুন তখনো চোখ খোলেনি। সে বিড়বিড় করে কোনো এক অজানা মন্ত্র জপ করছিল।

হঠাৎ অর্জুন চোখ মেলল। তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন ফরিদার বোরকা ভেদ করে সরাসরি তার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। ফরিদা চমকে এক পা পিছিয়ে গেল।

অর্জুন কর্কশ কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, "বড্ড দেরি করে এলে মা। মনের ভেতর যখন ক্ষোভ আর হাহাকার জমে পাথর হয়ে যায়, তখন মহাকালের দোয়ারে করাঘাত করতে হয়। তুমি কি জানো তুমি কার দুয়ারে এসেছ?"

ফরিদা কোনোমতে তার কান্না চেপে জড়িয়ে ধরা গলায় বলল, "আমি জানি আপনি চাইলে সব পারেন ঠাকুর। আমার ঘরটা বাঁচান। সমাজ আমাকে মুখ দেখানোর জায়গা রাখেনি। আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে দিতে চায়। একটা সন্তানের জন্য আমি আজ ভিখারিনী হয়ে আপনার দ্বারে এসেছি।"

অর্জুন একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসল। সে তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার দীর্ঘ শরীরটা ফরিদার ওপর এক বিশাল ছায়া ফেলল। সে ধীর পায়ে ফরিদার চারপাশটা একবার ঘুরে এলো, যেন কোনো শিকারি তার শিকারকে পরখ করে দেখছে।

অর্জুন বলল, "সন্তান? সন্তান তো আকাশের বৃষ্টি নয় যে চাইলেই ঝরে পড়বে। সন্তান হলো এক আধ্যাত্মিক সংযোগ। মা ভৈরব তো এমনি এমনি কাউকে কিছু দেন না। তুমি ত্যাগের জন্য প্রস্তুত তো? মা যা দেবেন, তার সমান মূল্যের কিছু কেড়েও নেবেন। তুমি কি নিজের সবচেয়ে প্রিয় কিছু বিসর্জন দিতে পারবে?"

ফরিদা ডুকরে কেঁদে উঠল। সে অর্জুনের পা ছুঁতে চাইলে অর্জুন ছিটকে সরে গেল।

"পা ছুঁতে হবে না! আগে নিজের সংকল্প শক্ত করো। আজ থেকে তিন দিন পর আমাবস্যা। এই তিন দিন তোমাকে কেবল ফল আর জল খেয়ে থাকতে হবে। মনে কোনো কুচিন্তা রাখা চলবে না। আর আমাবস্যার রাতে, যখন গ্রামের সব বাতি নিভে যাবে, যখন শেয়ালের ডাকে রাত ভারী হবে—ঠিক সেই নিশিরাতে একা এই থানে আসতে হবে।"

ফরিদা চমকে উঠল। "নিশিরাতে? একা?"

অর্জুন তার মুখটা ফরিদার কানের কাছে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, "হ্যাঁ, একা। কোনো আলো আনা যাবে না, সাথে কেউ থাকবে না। বোরকার আড়ালে কেবল নিজের বিশ্বাসটুকু নিয়ে আসবে। মনে রেখো ফরিদা, বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। যদি ভয় পাও, তবে এসো না। কিন্তু যদি আসো, তবে কোল ভরা সম্পদ নিয়ে ফিরবে।"

অর্জুন একটা তামাটে বাটি থেকে কিছু কালচে ছাই আর একটা রক্তবর্ণের রেশমি সুতো ফরিদার দিকে এগিয়ে দিল।

"এই সুতোটা তোমার ডান কব্জিতে শক্ত করে বেঁধে রাখো। আর এই ছাইটুকু প্রতিদিন রাতে কপালে মেখে ঘুমাবে। আমাবস্যার রাতে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।"

ফরিদা সুতোটা হাতে নিয়ে যখন পিছু ফিরল, তখন তার বুক ধকধক করছিল। সে বুঝতে পারছিল না সে কি কোনো অলৌকিক মুক্তির পথে যাচ্ছে নাকি কোনো অন্ধকার আদিম লালসার গহ্বরের দিকে। তার শরীর ঘামছিল, বোরকাটা যেন তাকে শ্বাসরোধ করে মারছে। কিন্তু তার মনের ভেতরের সেই মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে এক ধরণের উন্মাদ সাহস জোগালো।

ফরিদা চলে যাওয়ার পর অর্জুন বটগাছটার দিকে তাকিয়ে আবার সেই রহস্যময় হাসি হাসল। সে তার পুরনো, চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। সেখানে সারি সারি নাম লেখা—হেনা, জবেদা, কুলসুম...। এই নামগুলোর পাশে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া। অর্জুন তার কলম দিয়ে ডায়েরির শেষ পাতায় বড় বড় করে লিখল— 'ফরিদা'।

অর্জুন বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "অন্ধকার যখন ঘনিয়ে আসে, তখন মানুষ আলোর লোভে শয়তানের কাছেও মাথা নত করে। ফরিদা, তুমি জানো না এই থানের নিচে কী লুকানো আছে। তুমি জানো না এই বরদানের মূল্য কতটা চড়া।"

অর্জুন তার শাঁখটা তুলে নিল। গভীর জঙ্গলে শাঁখের সেই বিকট আর গমগমে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, যেন কোনো আসন্ন বিপদের সংকেত দিচ্ছে। ফরিদা তখন গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল পেছনে কেউ একজন খড়ম পায়ে তাকে অনুসরণ করছে। সে ফিরে তাকালো, কিন্তু কেউ নেই। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরে কোথাও কুকুরের করুণ কান্না শোনা যাচ্ছে.............


লেখা : দিপ সিংহ রায়।


[চলবে..]


[দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন]





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ