সন্ন্যাসীর থান || অলৌকিক বরদান (দ্বিতীয় পর্ব)

সন্ন্যাসীর থান || অলৌকিক বরদানদ্বিতীয় পর্ব: নিশিরাতের অন্ধকার সাধনা

Dip's Dark Story



তিন দিন পার হয়ে গেল। এই তিন দিন ফরিদা যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিল। অর্জুনের দেওয়া সেই কালচে ছাই কপালে মাখলেই তার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আসত। স্বপ্নে সে দেখত এক বিশাল কালো ছায়া তাকে গ্রাস করতে আসছে, আবার পরক্ষণেই দেখত তার কোলে এক ফুটফুটে সন্তান।

 এই ভয় আর আশার দোলাচলে ফরিদার শরীর ভেঙে পড়েছে, কিন্তু মনের জেদ দানা বেঁধেছে আরও শক্ত হয়ে। আজ সেই ভয়ংকর অমাবস্যার রাত।

গ্রামের আকাশটা আজ কুচকুচে কালো। আকাশে একটা তারাও নেই, যেন বিশাল একখণ্ড কালো কাপড় কেউ মহাকাশে বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়িতে রাত বারোটা বাজার সাথে সাথেই গ্রামের শেষ মাথার শিয়ালগুলো সমস্বরে ডেকে উঠল। ফরিদা সাবধানে বিছানা ছাড়ল।

 পাশে তার স্বামী করিম অঘোরে ঘুমাচ্ছে, মদের তীব্র গন্ধ তার শরীর থেকে বের হচ্ছে। ফরিদা কাঁপা হাতে তার কালো বোরকাটা পরে নিল। নিকাব দিয়ে মুখটা ভালো করে ঢেকে সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের হাতটাও দেখা যাচ্ছে না।

 অর্জুনের নির্দেশ ছিল—কোনো আলো আনা যাবে না। ফরিদা মেঠো পথ ধরে এগোতে লাগল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে তার বুকের ধকধকানি বেড়ে যাচ্ছিল। যত সে বনের কাছাকাছি যাচ্ছে, বাতাসের সেই অদ্ভুত 'শোঁ শোঁ' শব্দটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাতাস যেন তাকে ফিসফিস করে বলছে—"ফিরে যা ফরিদা! এখনো সময় আছে, ফিরে যা!"

কিন্তু ফরিদা থামল না। মাতৃত্বের তৃষ্ণা তাকে এক উন্মাদ সাহসে পরিণত করেছে। বনের একদম শেষ মাথায় পৌঁছাতেই সে থানের সেই বিশালাকার বটগাছটা দেখতে পেল। অন্ধকারের মাঝেও গাছটা যেন একটা বিশাল দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। থানের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট প্রদীপ জ্বলছে, যার আলো অত্যন্ত ক্ষীণ।
থানের চত্বরে পা রাখতেই ফরিদার নাকে এক তীব্র সুগন্ধ এল। 

এটা সাধারণ কোনো আগরবাতি নয়; এর মধ্যে কেমন যেন একটা বুনো আর মাদকতাময় ঘ্রাণ আছে, যা শরীরকে অবশ করে দেয়। অর্জুন থানের ঠিক সামনে বসা, তার পরনে কেবল একটা গেরুয়া রঙের ধুতি। উম্মুক্ত প্রশস্ত বুক আর পেশিবহুল হাতগুলো প্রদীপের আলোয় চকচক করছে। সে চোখ বুজে কোনো এক গুঢ় মন্ত্র জপ করছিল।
ফরিদা ধীর পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার উপস্থিতি টের পেয়েও অর্জুন চোখ খুলল না। সে কেবল শান্ত গলায় বলল, "এসেছ ফরিদা? আমি জানতাম তুমি আসবে। তোমার ভেতরের তৃষ্ণা তোমাকে ঠিক নিয়ে আসবে।"
ফরিদা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, "আমি এসেছি ঠাকুর। আমাকে ফেরাবেন না।".

অর্জুন এবার চোখ মেলল। তার চোখের মণি দুটো যেন জ্বলছে। সে উঠে দাঁড়াল এবং ফরিদার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। ফরিদা নিকাবের ভেতর দিয়েও অনুভব করতে পারল অর্জুনের শরীরের উত্তাপ। অর্জুন তার হাত বাড়িয়ে ফরিদার বোরকার ওপর দিয়ে তার ডান হাতটা ধরল।

"আজকের এই সাধনা কেবল তোমার আর এই থানের। মা ভৈরব আজ জাগ্রত। কিন্তু মনে রেখো, সিদ্ধি লাভের পথ বড় পিচ্ছিল। তোমাকে এখন এই থানের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে কোনো পর্দা নেই, কোনো সামাজিক পরিচয় নেই—সেখানে কেবল তুমি এক তৃষ্ণার্ত নারী আর আমি তোমার সেই তৃষ্ণা মেটানোর মাধ্যম।"
অর্জুন থানের পেছনের একটি ভারী পাথরের দরজা সরাল। 

ভেতরে একটা সরু সিঁড়ি নেমে গেছে মাটির নিচে। ফরিদা ভয় পেলেও পিছিয়ে যাওয়ার পথ নেই। অর্জুন তাকে পথ দেখিয়ে নিচে নিয়ে গেল। নিচে ছোট একটি ঘর, যার দেয়ালগুলো পাথরের। সেখানে বাতাস ভারী হয়ে আছে চন্দন আর কর্পূরের গন্ধে। ঘরের মাঝখানে একটি বেদিতে কিছু প্রাচীন চিহ্ন আঁকা।

অর্জুন ফরিদার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "এই পবিত্র স্থানে বোরকা বা নিকাব রাখা নিষিদ্ধ। এখানে তোমাকে আসতে হবে একদম পবিত্র রূপে, যেমনটা ঈশ্বর তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। নিজের সমস্ত আবরণ বিসর্জন দাও, তবেই মা ভৈরব তোমার কোলে নতুন জীবন দান করবেন।"

ফরিদা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল। তার পর্দার আড়ালে থাকা শরীরটা আজ এক পরপুরুষের সামনে অনাবৃত করতে হবে? কিন্তু পরক্ষণেই তার কানে বেজে উঠল সমাজের গালি আর স্বামীর লাঞ্ছনা। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং ধীরে ধীরে তার বোরকার বোতাম খুলতে শুরু করল।

অন্ধকার সেই ভূগর্ভস্থ কক্ষে প্রদীপের আলো কাঁপছে। অর্জুন এক অদ্ভুত সম্মোহনী দৃষ্টিতে ফরিদার দিকে তাকিয়ে আছে। সে তার ডায়েরিটা পাশে রেখে অর্ঘ্য সাজাতে শুরু করল। ডায়েরির পাতায় তখন নতুন একটি অধ্যায় লেখা হচ্ছে, যার শিরোনাম— "আমাবস্যার রক্তঋণ"।

অর্জুন ফরিদার চিবুক স্পর্শ করে বলল, "ভয় পেয়ো না মা। এই লজ্জাটুকু আজ বিসর্জন দাও, বিনিময়ে তুমি পাবে সেই সম্পদ যা পুরো দুনিয়া তোমাকে দিতে পারেনি।"

বনের ওপর দিয়ে তখন বজ্রপাতের গর্জন শোনা গেল। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। কিন্তু মাটির নিচের সেই গোপন কক্ষে তখন শুরু হতে যাচ্ছে এক অন্যরকমের লীলা, যা কেবল ভৈরব সন্ন্যাসী আর অর্জুনের জানা।




"৩য় পর্বে আসছে ফরিদার জীবনের সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত এবং অর্জুনের কালো ডায়েরির রহস্য। সাথেই থাকুন!"


লেখা : দিপ সিংহ রায়।

.[চলবে..]





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ