আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (৫ম পর্ব)
ভোরের সেই মরা আলো যখন জানালার ভারি পর্দা চিরে গেস্টরুমের মেঝেতে আছড়ে পড়ল, তখন আমার মনে হলো আমি যেন কোনো এক বিভীষিকাময় অন্ধকার যুগ পার করে এই মাত্র পৃথিবীতে কোনোমতে বেঁচে ফিরলাম। আমি বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে ছিলাম। আমার সারা শরীরে সুনিলের সেই পৈশাচিক সোহাগের নীল আর লালচে দাগগুলো দগদগে ক্ষতের মতো জ্বলজ্বল করছে।
বিশেষ করে গলার পাশটায় তার দাঁতের কামড় আর কাঁধের ওপর নখের আঁচড়গুলো এখনো এক ধরণের অদ্ভুত জ্বালা আর শিহরণ তৈরি করছে। আমার শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত, যেন প্রতিটি হাড় কোনো এক অদৃশ্য যন্ত্রে পিষে আলাদা করে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের আর ভয়ের বিষয় হলো—সেই অসহ্য ক্লান্তির গভীরেও এক অদ্ভুত, বিষাক্ত এবং নিষিদ্ধ তৃপ্তির রেশ এখনো রয়ে গেছে। আমি নিজেকে মনে মনে সহস্রবার ঘৃণা করতে চাইছি, আয়নার সামনে গিয়ে নিজের মুখে থুতু দিতে চাইছি, কিন্তু আমার অবচেতন মন এক বিশ্বাসঘাতকের মতো বারবার সেই কালরাতের অস্ফুট গোঙানি আর সুনিলের সেই আদিম, পেশিবহুল শরীরের উত্তপ্ত স্পর্শের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমি যেন এক মরীচিকার পেছনে ছুটছি—যেখানে একদিকে আছে আজন্মলালিত ধর্মের বুলি আর পবিত্রতার দাবি, আর অন্যদিকে শরীরের সেই পৈশাচিক ক্ষুধা যা কাল রাতে সুনিল প্রথমবার আমাকে চিনিয়েছে।
আমি টলতে টলতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আয়নার ওপাশে যে নারী দাঁড়িয়ে আছে, তাকে আমি চিনি না। তার চোখ দুটো বসা, ঠোঁটগুলো কিছুটা ফোলা আর সারা গায়ে এক বুনো জানোয়ারের হাতের ছাপ। এ কি সেই মারিয়াম যে তসবিহ হাতে সারাদিন ঘরের শুচিতা রক্ষা করে? নাকি এ সেই মানবী যে কাল রাতে একজন লম্পট পশুর পায়ের তলায় নিজেকে সঁপে দিয়ে এক আদিম অন্ধকার সুখে নিমজ্জিত হয়েছিল?
ঘর থেকে বেরিয়ে যখন ডাইনিং হলের দিকে পা বাড়ালাম, আমার বুকটা ধক করে উঠল। ড্রয়িংরুমের সোফায় আমার স্বামী বরাবরের মতোই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন। তার সামনে রাখা ধর্মীয় ক্যালেন্ডার, আর আঙ্গুলের ডগায় ঘুরছে তসবিহ। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি জগতের সব কঙ্কিলতা থেকে মুক্ত এক ফেরেশতা।
আমাকে দেখা মাত্রই তিনি এক প্রশান্ত, পবিত্র মুচকি হাসি দিলেন। সেই হাসিতে এক ধরণের পৈশাচিক ব্যবসায়িক বিজয় লুকানো ছিল। তিনি ধীর স্বরে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বললেন, "মারিয়াম, কাল রাতে মেহমানের আপ্যায়নটা সত্যিই চমৎকার হয়েছে। সুনিল সাহেব খুব ভোরে যখন বিদায় নিলেন, তখন তাকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল। আমাদের নতুন ফ্যাক্টরির লাইসেন্স আর ওই বড় ডিলটা আজই চূড়ান্ত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তোমার এই ত্যাগের সওয়াব আল্লাহ দেবেন।"
তার এই 'ইনশাআল্লাহ' আর 'সওয়াব' শব্দগুলো আমার কানে ফুটন্ত সীসার মতো লাগল। নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী করে যে স্বামী সওয়াব আর পরকালের কথা বলে, তার মতো বীভৎস ভণ্ড আর মুনাফেক এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কি? আমি কোনো উত্তর দিলাম না, কারণ আমার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আমি কেবল অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রান্নাঘরের দিকে যেতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে আমার বড় মেয়ে নেমে এল।
কাল রাতের জানালার ওপাশে থাকা সেই নিথর মেয়েটি এখন যেন অন্য কেউ। তার চেহারায় গতকাল রাতের সেই কান্না বা চরম ঘৃণা এখন এক অদ্ভুত, বরফ শীতল স্থিরতায় রূপ নিয়েছে। সে সোজা গিয়ে তার বাবার সামনে দাঁড়াল। আমি আড়াল থেকে লক্ষ্য করলাম।
সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, "বাবা, কাল রাতে পেছনের জানালার বাইরে একজোড়া বিশাল চোখ দেখেছিলাম। মনে হলো কেউ আমাদের বাড়ির ভেতরের সব নোংরামি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।"
আমার স্বামীর হাতের তসবিহটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার আঙুলগুলো কি একটু কাঁপল? তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বললেন, "হয়তো কোনো চোর বা বিড়াল হবে মা। তুই এসব নিয়ে ফালতু মাথা ঘামাস না। আমাদের বাড়ির প্রাচীর অনেক উঁচু, কেউ ভেতরে ঢোকার সাহস পাবে না।"
আমার মেয়ে আর কথা বাড়ালো না। তার সেই রহস্যময় নীরবতা যেন হাজারো চিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর। সে ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এল যেখানে আমি ভয়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি ব্যস্ত হওয়ার চরম ভান করে অকারণে থালাবাসন নাড়াচাড়া করতে লাগলাম যাতে তার চোখের দিকে তাকাতে না হয়। কিন্তু সে আমার একদম কাছে এসে দাঁড়াল।
তার শরীর থেকে এক ধরণের অদ্ভুত হিমশীতলতা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সে একটু ঝুঁকে পড়ে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার তপ্ত নিশ্বাস আমার ঘাড়ে লাগতেই আমি শিউরে উঠলাম, কাল রাতের সুনিলের ছোঁয়ার কথা মনে পড়ে আমার শরীর কাঁপতে লাগল। সে ফিসফিস করে অত্যন্ত বিষাক্ত এবং শ্লেষমাখা স্বরে বলল:
"আম্মু, একা একা কেন সব সুখ ভোগ করছো? আমি জানি তোমার ভেতরে এখন কেমন আগুন জ্বলছে। সুনিল কাকা তো আমারও অনেক প্রিয়, তাই না? ওনার হাতের ছোঁয়া কি খুব বেশি জাদুকরী?"
আমি স্থবির হয়ে গেলাম। আমার হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে হাজার টুকরো হয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ঠিক যেমনটা চূর্ণ হয়েছে আমার মাতৃত্ব। মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিচিত্র, আদিম লালসার হাসি হাসল—যে হাসিতে কোনো মায়া নেই, আছে কেবল এক ভয়ংকর অন্ধকারের ইঙ্গিত। সে আর কিছু না বলে ধীর পায়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে গেল, যেন কিছুই হয়নি।
ঠিক এই মুহূর্তেই আমার শাড়ির ভাঁজে রাখা ফোনটা তীব্রভাবে ভাইব্রেট করে উঠল। সুনিলের মেসেজ। কাঁপাকাঁপা আঙুলে ইনবক্স খুললাম:
"মারিয়াম, কাল রাতের সেই অস্ফুট গোঙানি আর তোমার শরীরের সেই বুনো কাঁপন এখনো আমার রক্তে মাদকতা তৈরি করছে। তবে শোনো, শুধু তোমাকে দিয়ে আমার এই রাক্ষুসে তৃষ্ণা মিটবে না। তোমার বড় মেয়েটাকেও আমার চাই। ও আজ দুপুরেই আমার অফিসে আসবে নথিপত্র সই করার বাহানায়। ওকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা একদম করো না। মনে রেখো, তোমার আর তোমার স্বামীর সব কুকীর্তির ভিডিও এখন আমার পকেটে। তুমি যদি আমার পায়ের তলার দাসী হয়ে থাকতে পারো, তবে তোমার মেয়ে কেন নয়? আজ থেকে তোমরা দুজনেই আমার আড়ালের অন্ধকার দুনিয়ার দুই রানি।"
আমি দেয়াল ধরে মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়লাম। চোখের সামনে আমি কেবল নিকষ কালো অন্ধকার দেখছি। সুনিল এখন আমাদের পুরো পরিবারকে এক পৈশাচিক মাকড়সার জালে আটকে ফেলেছে। আমার স্বামী ড্রয়িংরুমে বসে তখনো পরম শান্তিতে তসবিহ টিপছেন, অথচ তিনি জানেন না যে তার তিলে তিলে গড়া 'সম্মানের দুর্গ' এখন সুনিল কান্তি দাসের পায়ের ধুলো হয়ে গেছে।
আর আমার মেয়ে? সে কি প্রতিশোধ নিতে সুনিলের অফিসে যাচ্ছে, নাকি সেও আমার মতো ওই নিষিদ্ধ আদিম সুখের মোহে স্বেচ্ছায় ধরা দিতে চাইছে? আমি কি মা হিসেবে তাকে আটকাবো, নাকি ওই অন্ধকারের ভাগীদার করে আমরা দুজনেই সুনিলের হাতের কামনার খেলনা হয়ে থাকবো? রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই আমি বুঝতে পারলাম, এই বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এখন পচা লাশের গন্ধ। আমরা সবাই এখন এক পৈশাচিক তৃপ্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। ধর্মের চাদর সরিয়ে আমরা এখন নগ্ন সত্যের মুখোমুখি।
[চলবে...]
লেখা: দিপ সিংহ রায়।
পর্বটি কেমন লাগলো কমেন্টে জানান।
ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার করবেন বন্ধুদের সাথে।

1 মন্তব্যসমূহ
অসম্ভব সুন্দর হয়েছে। দ্রুত আপডেট দিলেই অনেক বেশি খুশি হব।
উত্তরমুছুন