আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (৩য় পর্ব)

 আড়ালের অন্ধকার - মারিয়াম বেগমের জবানবন্দি (৩য় পর্ব)







জানালার কাঁচের ওপাশে সেই স্থির ছায়াটা দেখে আমার রক্ত মুহূর্তের মধ্যে হিম হয়ে গেল। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন এক অজানা পৈশাচিক আতঙ্কে খাড়া হয়ে উঠেছে। আমি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, যেন এক জীবন্ত পাথর। সুনিল পর্দার আড়াল থেকে এক মুহূর্তের জন্য বাইরে তাকাল। আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো ভয় পাবে, হয়তো আমাদের এই নিষিদ্ধ খেলার সমাপ্তি এখানেই ঘটবে,

 আর আমি এই নরক থেকে নিষ্কৃতি পাব। কিন্তু না! সুনিলের ঠোঁটের কোণে হঠাৎ এক পৈশাচিক এবং কুৎসিত হাসি ফুটে উঠল। সে যেন এই চরম মুহূর্তটির জন্যই এতদিন অপেক্ষা করছিল। সে যখন জানালার পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করল, বাইরের ল্যাম্পপোস্টের মরা হলদেটে আলোর নিচে ধরা পড়ল সেই অতি পরিচিত মুখ।

আমার বড় মেয়ে! যে মেয়েকে আমি সারাজীবন পর্দার গুরুত্ব বুঝিয়েছি, যাকে বলেছি হায়া আর শ্লীলতাই নারীর শ্রেষ্ঠ অলংকার, সেই মেয়ে আজ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নিজের চোখে দেখছে তার জননীর চরম অধঃপতন। তার সেই নিষ্পাপ চোখে আজ কোনো জল নেই, নেই কোনো আর্তনাদ; আছে কেবল এক অবর্ণনীয় ঘৃণা, বিস্ময় আর এক বিশাল শূন্যতা।

 সে দেখছে তার ‘কাকা’ বলে সম্বোধন করা মানুষটা কীভাবে তার মায়ের বোরকার অবশিষ্টাংশ হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলেছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—সে নিশ্চিতভাবেই জানে, তার ‘পরহেজগার’ বাবা ড্রয়িংরুমের দরজায় বসে তসবিহ হাতে এই জঘন্য পাপের পাহারায় মগ্ন।

সুনিল ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, বরং তার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা আদিম পশুটা যেন এক নতুন তাজা শিকারের গন্ধে আরও চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে জানালার দিকে তাকিয়েই আমাকে হ্যাঁচকা টানে নিজের কামনার কাছে নিয়ে এল। তার খসখসে আর তামাকের দুর্গন্ধমাখা হাতের মুঠো আমার রেশমি চুলে এমনভাবে বসল যেন সে কোনো শিকারি পশু।

 ব্যথায় আমার চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সুনিল তাতে এক পৈশাচিক তৃপ্তি পেল। সে আমার কানের লতিটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে খোনা গলায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, "দেখো মারিয়াম, তোমার বড় মেয়েটা তো দেখি বেশ ডাগরডোগর হয়েছে! কী চমৎকার গড়ন ওর! জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে ও আজ যা দেখছে, তাতে ওর রক্তেও তো এখন উত্তাল আগুন লাগার কথা। ও তো এখন নিজের চোখে দেখছে ওর মা আসলে ভেতরে ভেতরে কতটা উত্তপ্ত।"

সুনিল এবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। তার নোংরামি আর পাশবিকতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে জানালার দিকে সরাসরি তাকিয়েই উচ্চস্বরে কিন্তু চাপা গলায় বলতে লাগল, "জানিনা তোমার ওই ভণ্ড স্বামী বাইরে বসে ঠিক কীসের ইবাদত করছে, কিন্তু ও তো নিজের ঘরেই আস্ত এক হুর রেখে দিয়েছে! 

তোমার ওই বড় মেয়েটা... ও তো দেখছি হুবহু তোমার মতোই এক রসালো মাল! আহা, মা-মেয়ে দুজনকে যদি একসাথে এই বিছানায় পেতাম, তবেই তো হতো আসল উৎসব! কী বলো মারিয়াম? এই স্বর্গীয় সুখ কি তুমি একা পেতে চাও?"

সুনিলের এই বীভৎস আর জঘন্য কথাগুলো শোনার পর আমার মনে হলো মাথার ওপরের ছাদটা যেন মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে পড়ছে। আমি তার সেই ঘামাক্ত আর শক্তিশালী বাহুবন্ধন থেকে বাঁচার জন্য মরণপণ ছটফট করছিলাম, কিন্তু আমার সেই প্রতিরোধ কেবল তার কামনার আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে এক বুনো উল্লাসে ফেটে পড়ে আমাকে বিছানার মাঝখানে সজোরে আছড়ে ফেলল। 

সে আমার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসে বলতে লাগল, "তোমার স্বামী বাইরে বসে তসবিহ গুনছে আর ভাবছে সে এক বিশাল ব্যবসায়িক ডিল বাগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে জানে না যে আজ আমি শুধু তোমাকেই নয়, তোমার ওই পবিত্র মেয়েটাকেও আমার কামনার নজরে নিয়ে নিয়েছি। আজ তুমি আমার শিকার, আর কাল হয়তো ও হবে। আমি ওকেও এই অন্ধকার জগতের স্বাদ দেবই দেব।"

সুনিলের সেই উত্তাল স্পর্শ আর আক্রমণাত্মক সোহাগে আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র যেন এক নিষিদ্ধ আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হলো। একদিকে আমার মাতৃত্বের হাহাকার আর ঘৃণা, অন্যদিকে আমার শরীরের প্রতিটি কোষ এক নিষিদ্ধ সুখে শিহরিত হচ্ছিল। সুনিলের পেশিবহুল হাতের বেষ্টনীতে আমি নিজেকে সঁপে দিচ্ছিলাম। তার আঙুলের স্পর্শ যেখানেই লাগছিল, সেখান থেকেই যেন এক আগুনের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। আমার কণ্ঠ চিরে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসছিল এক ধরণের অস্পষ্ট গোঙানি। সেই গোঙানি কি যন্ত্রণার? নাকি এক দীর্ঘ অতৃপ্তির পর পাওয়া নিষিদ্ধ তৃপ্তির? আমি নিজেও তখন জানি না।

সুনিলের বুনো স্পর্শে আমার ভেতরে এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির উদয় হলো, যা আগে কোনোদিন আমার স্বামী মেটাতে পারেনি। আমার স্বামীর সেই যান্ত্রিক স্পর্শের চেয়ে সুনিলের এই পৈশাচিক আদিমতা আমাকে বেশি গ্রাস করছিল। আমি ঘৃণা করতে চেয়েও পারছিলাম না, বরং এক অদৃশ্য টানে তার আরও কাছাকাছি হওয়ার এক তীব্র বাসনা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছিল। আমার অবচেতন মন যেন বিদ্রোহ করে উঠল। আমি বিড়বিড় করে বললাম, "আরো বেশি সুখ দাও সুনিল... আমি সহ্য করতে পারছি না... এই নরকের আগুন যেন আমাকে চিরতরে জ্বালিয়ে দেয়।"

আমার অস্ফুট গোঙানি আর শরীরের অস্থিরতা দেখে সুনিল আরও হিংস্র হয়ে উঠল। আমি জানালার ওপাশে থাকা আমার মেয়ের সেই ঘৃণাভরা দৃষ্টির কথা মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলাম। আমার মনের কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে এক পৈশাচিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আমি সুনিলকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বললাম, "সুনিল, শুধু আমি নই... আমরা দুজনেই তোমার দাসী হবো। আমি আর আমার মেয়ে—দুজনেই তোমার এই কামনার আগুনে ঝাঁপ দেব। তুমি শুধু আমাদের মুক্তি দিও না, আমাদের এই সুখের সাগরে ডুবিয়ে রাখো চিরকাল।"

সুনিল হাসল—সে আমার এই শরীরী ভাষার পরিবর্তন আর আমার চূড়ান্ত পতনটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারল। সে আরও বেপরোয়া হয়ে আমাকে সোহাগের এক উত্তাল সাগারে ভাসিয়ে দিল। আমার মনে হলো, জানালার ওপাশের সেই ঘৃণাভরা দৃষ্টি আর দরজার ওপাশের স্বামীর ভণ্ডামি যেন কোনো সুদূর অন্য জগতের তুচ্ছ ঘটনা। এই ঘরের চার দেয়ালের মাঝখানের এই নিষিদ্ধ মুহূর্তটাই যেন এখন মহাবিশ্বের একমাত্র সত্য।

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে সুনিলের সেই কুৎসিত জানোয়ারের মতো অট্টহাসি আর আমার সুখ আর যন্ত্রণার মিশ্রিত রুদ্ধশ্বাস আর্তনাদ এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল। জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নিথর মেয়েটি আর দরজার ওপাশে পাহারায় থাকা সেই ভণ্ড স্বামী—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি আজ এক চরম পতনের সুখে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি কেবল ভাবছিলাম, এই যে পর্দা, এই যে ধর্মীয় আভিজাত্য—এসব আজ এই বীভৎস এবং মধুর সত্যের সামনে কতটা তুচ্ছ।


[চলবে...]


লেখা: দিপ সিংহ রায়।


আপনার মূল্যবান মন্তব্য নিচে লিখে জানান। আপনাদের উৎসাহ পেলে দ্রুতই নিয়ে আসব "আড়ালের অন্ধকার"-এর পরবর্তী রোমাঞ্চকর পর্ব। "ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. গল্প পড়ে দুই রানের মাঝে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছে। আরো বড় আপডেট চাই

    উত্তরমুছুন
  2. ওয়েবসাইটে ডার্ক মোড যুক্ত করার অনুরোধ রইলো।

    উত্তরমুছুন